বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের প্রত্যাশা নতুন নয়; তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই প্রত্যাশাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমান যে কয়েকটি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে তার ছবি সংবলিত বিলবোর্ড ও ব্যানার দ্রুত অপসারণের নির্দেশ। ক্ষমতার অলংকারে নিজেকে সাজানোর চেয়ে প্রশাসনিক সংযমের এই বার্তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যেখানে ব্যক্তিপূজার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত, সেখানে এমন নির্দেশ জনমনে আশার সঞ্চার করে।
তবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রাথমিক ইমেজ নির্মাণের বাইরে আরও কিছু প্রশ্ন ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ে চারজন ডেপুটি প্রেস সচিব নিয়োগের সিদ্ধান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিষয়টি শুধু নিয়োগ সংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাজনৈতিক আস্থা, দলীয় ত্যাগের মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের বার্তার সঙ্গে জড়িত।
প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রেস উইংয়ে যারা কাজ করেছেন দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর দুর্দিনে যারা লেখালেখি করেছেন, দলীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন কিংবা সমালোচনার মুখে রাজনৈতিক যুক্তি তুলে ধরেছেন তাদের একটি অংশের মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি স্পষ্ট। কেউ কেউ মনে করছেন, পরীক্ষিত ও নিবেদিত সাংবাদিকদের পাশ কাটিয়ে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের অতীত রাজনৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ অথবা অন্ততপক্ষে অস্পষ্ট।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু তথ্য ও স্ক্রিনশট ঘিরে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এর একটি পুরোনো ছাত্রসংগঠনের কমিটির তথ্য তুলে ধরে দাবি করা হচ্ছে, অন্য রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ প্রেস উইংয়ে স্থান পেয়েছেন। একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, অতীতে শেখ হাসিনা সরকারের প্রশংসা করা বা বিএনপি’র সমালোচনা করা ব্যক্তিরাও নিয়োগ তালিকায় আছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা অবশ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব; তবে অভিযোগের অস্তিত্বই জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় সামনে আসে রাজনৈতিক আনুগত্য বনাম পেশাগত যোগ্যতা। রাষ্ট্র পরিচালনায় পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার মূল্য অস্বীকার করা যায় না। প্রেস উইংয়ের মতো সংবেদনশীল দপ্তরে তথ্যপ্রবাহ, বার্তা নির্মাণ এবং সংকট মোকাবিলার দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি দলের কর্মী-সমর্থকদের প্রত্যাশা থাকে যে, দুঃসময়ে পাশে থাকা মানুষদের মূল্যায়ন করা হবে।
বিএনপি’র ইতিহাসে আত্মসমালোচনার একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের আগে। দলীয় চেয়ারম্যান তার ভাষণে অতীতের ভুল-ত্রুটির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। ২০০১-২০০৬ সালের জোট সরকারের সময়কার বিতর্ক ও সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন। সে সময় সরকারের অংশীদার ছিল বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি এবং তাদের মিত্ররা। কিন্তু রাজনৈতিক দায়ভার প্রশ্নে মিত্রদের অবস্থান নিয়ে তৎকালীন ও পরবর্তী সময়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়। এই অভিজ্ঞতা বর্তমান নেতৃত্বকে আরও সতর্ক হওয়ার বার্তা দেয়।
সরকারের প্রধান হিসেবে বর্তমানে তারেক রহমান দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে সরকারের কোনো ব্যক্তি ভুল বা অনিয়ম করলে, দিনের শেষে তার রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়ভার শেষ পর্যন্ত তাকেই নিতে হবে। অতীতে ‘হাওয়া ভবন’কে কেন্দ্র করে যে আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়েছিল, তার দায়ভারও এখনো তাকে বহন করতে হচ্ছে।
প্রেস উইংয়ের নিয়োগ ইস্যু তাই কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের প্রশ্ন নয়; এটি রাজনৈতিক বার্তারও প্রশ্ন। যদি এমন ধারণা জন্ম নেয় যে দুঃসময়ের সাহসী কণ্ঠগুলো সুসময়ে উপেক্ষিত হচ্ছে, তাহলে ভবিষ্যতে কেউ ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হবে কী? রাজনীতিতে নৈতিক প্রণোদনা একটি বড় শক্তি। দলীয় সমর্থকদের কাছে এই বার্তা গুরুত্বপূর্ণ যে, তাদের ত্যাগ ও অবস্থান মূল্যহীন নয়।
অন্যদিকে, রাষ্ট্র পরিচালনায় নিরাপত্তা ও সংবেদনশীলতার বিষয়টিও অনস্বীকার্য। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মরত ব্যক্তিরা কেবল তথ্য ব্যবস্থাপনাই করেন না; তারা রাষ্ট্রের কৌশলগত বার্তা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্যের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ-এর অনেক রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের আগে প্রার্থীর পেশাগত ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিহাস পর্যালোচনা করা হয়। এর উদ্দেশ্য প্রতিহিংসা নয়; বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি ও দ্বৈত অবস্থান শনাক্ত করা।
বাংলাদেশের বাস্তবতায়ও এমন প্রক্রিয়া অস্বাভাবিক নয়। প্রযুক্তিগতভাবে কারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পূর্ববর্তী অবস্থান, সক্রিয়তার সময়কাল বা আচমকা মুছে ফেলা তথ্য যাচাই করা কঠিন কাজ নয়। প্রশ্ন হলো এই যাচাই কি নিয়মতান্ত্রিকভাবে করা হচ্ছে? যদি করা হয়, তাহলে সে তথ্য জনসমক্ষে আনা না হলেও অন্তত রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে পরিষ্কার থাকা উচিত।
এখানে একটি ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। শুধুমাত্র ভিন্নমত পোষণ করলেই কাউকে অযোগ্য বলা যায় না। গণতন্ত্রে মতের পার্থক্য স্বাভাবিক। কিন্তু যদি কেউ ধারাবাহিকভাবে একটি রাজনৈতিক আদর্শের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে থাকেন এবং হঠাৎ করেই সেই আদর্শের প্রতিনিধিত্বকারী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন, তাহলে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। অন্যথায় গুঞ্জন ও সন্দেহ রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে।
নতুন প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে প্রতীকী কিছু সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সংযম ও বাস্তববোধের ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিলবোর্ড অপসারণের নির্দেশ সেই ধারারই অংশ। এখন প্রয়োজন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও একই স্বচ্ছতা ও বার্তা নিশ্চিত করা। প্রেস উইংয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট মানদণ্ড, যোগ্যতার বিবরণ এবং যাচাই প্রক্রিয়ার কাঠামো জনসমক্ষে তুলে ধরা হলে বিতর্ক অনেকটাই প্রশমিত হতে পারে।
রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি’র সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ একদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব, অন্যদিকে দলীয় প্রত্যাশা ব্যবস্থাপনা। সরকার ও দল এক নয়; কিন্তু বাস্তবে প্রভাব একে অপরের ওপর পড়ে। তাই গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে পেশাগত দক্ষতা, রাজনৈতিক আস্থা এবং নিরাপত্তা এই তিনটির সমন্বয় অপরিহার্য।
এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বিশেষকে লক্ষ্য করা নয়। বরং এটি নতুন নেতৃত্বকে সহায়তা করার প্রয়াস যাতে ইতিবাচক সূচনার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, ছোট সিদ্ধান্তও বড় বার্তা দেয়। প্রেস উইংয়ের মতো স্পর্শকাতর দপ্তরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো তাই কেবল প্রশাসনিক ফাইলের বিষয় নয়; সেগুলো ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তিও নির্মাণ করে।
পরিবর্তনের প্রত্যাশায় থাকা জনগণ এবং দলীয় সমর্থকরা এখন দেখছেন ঘোষিত আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়িত হয়। স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্তই পারে সেই আস্থা সুদৃঢ় করতে। নতুন অধ্যায়ের শুরুতে শুভকামনা জানানো সহজ; কিন্তু সেই শুভকামনাকে স্থায়ী করতে প্রয়োজন বিচক্ষণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ।
রাজনীতি শেষ পর্যন্ত আস্থার শিল্প। সেই আস্থা রক্ষায় প্রতিটি নিয়োগ, প্রতিটি বার্তা এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নেতৃত্ব যদি এই বার্তাটি উপলব্ধি করে আগায়, তবে সমালোচনা সাময়িক থাকবেই ইতিবাচক পরিবর্তনই হয়ে উঠবে স্থায়ী বাস্তবতা।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

